শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সোনাডাঙ্গার জঙ্গলে

আহমদ মতিউর রহমান

তাসমিনি বেগমের সাথে চারজন হেঁটে চলেছে। মাঝারি রাস্তা ছেড়ে ছোট রাস্তা। তারপর একেবারে পায়ে চলার পথ। আবার চৌধুরি লজের নেম প্লেটটি পড়ে আজিম।  সাকিন চৌধুরি লজ। সাল ১৯৬৮। সাকিন ছোট অক্ষরের। চৌধুরি লজ একটু বড় হরফের। চৌধুরি বানানে আধুনিকতা রয়েছে। সবাই চৌধুরী লিখলেও এখানে ব্যতিক্রম।
বাড়িটিতে ভূতের উপদ্রব রয়েছে। দেখে কিন্তু মোটেই এটাকে ভূতের বাড়ি মনে হচ্ছে না আজিমের। বাড়িটা ভূতের বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় রাতে তেমন একটা কেউ আসে না। এই কথাটাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে চায় না তার।
তারা পাঁচজন গিয়ে জাব্বার চৌধুরির বসার ঘরে গিয়ে বসে। তাদের গেট থেকে নিয়ে যান জব্বারের একজন ভৃত্য। বয়সে ততো বুড়ো নন, কিন্তু কুজো হয়ে থাকার কারণে বুড়ো মনে হয়। তাকে দেখলে রহস্য কাহিনীর কোনো চরিত্র বলে মনে হবে। অন্তত আজিমের তাই মনে হচ্ছে।
একটু পর রুমে ঢুকলেন জাব্বার চৌধুরি। ধোপদুরস্ত পানজাবি পরা নিপাট এক ভদ্র লোক। উপরে একটা শাল চড়ানো। একটা আভিজাত্য ফুটে ওঠে তার চলায় বলায়।
: কি খবর বলো তাসমিনি? তোমার ক্ষুদে বন্ধুদের খাওয়া দাওয়া হয়েছে তো?
: না না আপনি ব্যস্ত হবেন না মামা। ওরা খেয়েছে। আমি খেয়েছি। আপনি কেমন আছেন?
: এই তো চলে যাচ্ছে। তো ইয়াং মেন তোমরা কয়েক দিন ঘুরেফিরে দেখো আমাদের সিলট। শ্রীহট্ট। মজা করলেন তিনি ওদের সাথে।  
: জি জি। নতুন ক্লাসে ওঠার আগেই এই একটু বেড়ানো আর কি। বলল আজিম।
: তো কি কি দেখবে বলো। আমি গাড়ি রেডি রাখব। তাসমিনি তুমিও যাবে নাকি?
: আমিও ছুটি কাটাচ্ছি মামা। মানে যাবার ইচ্ছা আরকি।
তারপর কথা আর এগুলো না। জাব্বার চৌধুরি শশব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তারপর তার কেয়ারটেকারকে কি যেন বলে বের হয়ে গেলেন।
আগে জানা গিয়েছিল জাব্বার চৌধুরি তাসমিনির আত্মীয়। এখন নিশ্চিত হওয়া গেল তিনি শুধু আত্মীয়ই নন নিকট আত্মীয়, মানে মামা।  
দোতলার একটা ঘরে তাদের চারজনের থাকার ব্যবস্থা হলো। তাসমিনি থাকবে কাছাকাছি তার এক খালার বাড়িতে। এটা রাতের ব্যবস্থা। দিনে থাকবে এখানেই।
স্বরাজ বললো -
: মেম মনে হয় ভূতে ভয় পায়, কি বলিস শিপন। শিপন কিছু বলে না। বলে আজিম-
: হতেই পারে। তবে এটা এভাবে বলা ঠিক নয়। তার তো কাজও থাকতে পারে। আর মনে রাখ তিনি এনেছেন আমাদের একটা কেস নিয়ে, রিজলভ করার জন্য। তার থাকা এখানে কি জরুরী?
রৌদ্র সব শুনছিল। এবার বলল- তোর কথাই ঠিক।
পেছন থেকে কেয়ারটেকার কথা বলে উঠলেন। দাদাভাইয়েরা কখন খাবেন? আপনাদের খানা লাগাতে বলি?
: না না। এখন নয়। নাস্তাটাস্তা খেয়েছি তো কেবল।
: বলছিলেন মিনি বহিনের কথা? ইনি এখানে থাকবেন কোথায়, থাকার ঘর এখন মাত্র দুখানা। একটাতে আপনারা থাকবেন। আরেকটা সর্বদা তালা মারা থাকে। দোতলার ঘরগুলোতে কেউ থাকতে চাইলেও পারে না।
তার মানে এতক্ষণ তাদের সব কথা শুনছিল কেয়ারটেকার। ভাবলো আজিম। তার মানে তার সাথে খাতির জমালে কিছু কথা জানা যাবে।
: কি সমস্যা দোতলায়? তুমি কত দিন এখানে আছ? তোমার নাম কি দাদা? একেবারে জেরার মতো শুরু করে স্বরাজ। ইশারায় অতো কথা না বলার ইঙ্গিত দেয় আজিম।  
জাব্বার চৌধুরিকে কেউ একথা বলে না। ফলে এটা উড়োকথা হিসেবেই আছে।
আর এ রহস্য উদ্ধারেই তাসমিনি বেগম ক্ষুদে দলটাকে দাওয়াত করে এনেছে। অবশ্য এতো ইতিহাস ছেলের দল জানে না।
কোন একজন কেয়ারটেকার থাকেন। কিন্তু এখানে তা নয়। এখানে জাব্বার সাহেব বাস করেন। তার বয়স্ক তিন ছেলে মেয়ে। সবাই বাইরে থাকে। আসা যাওয়া করে। আপাতত তিনি তার মিসেস আর দুটো কাজের লোক। এইই এ বাড়ির লোকজন।
তাতে কিছু যাবে আসবে না। তাসমিনি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
একরাত কাটলো তাদের ভূতের বাড়িতে। কিন্তু তেমন কিছু দেখা গেল না।
কেয়ারটেকার জুলমাত আলী বেশ মজার লোক। দেখলে তাকে কম কথার মানুষ মনে হবে। কিন্তু বেতের ঘা দিলে বেশ কথা বলেন। আজিমের তাই মনে হয়।
রাতে তাকে ম্যানেজ করে দোতলার ঘরগুলো ঘুরে আসে আজিম আর স্বরাজ। ম্যানেজ করা মানে শিপন আর রৌদ্র নানা কথায় ছুতানাতায় তাকে ব্যস্ত রাখে। সেই ফাঁকে এক চক্কর ঘুরে আসে আজিম ও স্বরাজ।
তেমন রহস্যের কিছুই নয়। ঘরগুলো তালা দেয়া নেই। দুটি কক্ষ পাশাপাশি। একটি করে কাঠের দরজা। দুপাশে দুটো করে জানালা। কিছু কিছু ফার্নিচারও আছে। কয়েকটি কাঠের চেয়ার পাতা আছে। খাটগুলো অনেক দিন ধরে অব্যবহৃত। ঝাড়পোছ হয় না নিয়মিত। দেখে এমনটাই মনে হয়েছে আজিমের।   (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ